প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ২২, ২০২৬, ৫:০০ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ ডিসেম্বর ১৯, ২০২৪, ৫:০৮ অপরাহ্ণ

জুবায়ের খান প্রিন্স।। পাবনা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার মারুফা মঞ্জুরী খানের বদলীর সংবাদে পাবনার সাংস্কৃতিক অঙ্গন খুশির বন্যায় ভাসছে।
নিজ জেলা শহর পাবনাতে জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার হওয়ার সুবাদে ধরাকে সরা জ্ঞান করে চলতেন তিনি। পাবনা শিল্পকলা একাডেমিকে করেছিলেন বিভিন্ন অনিয়মে জর্জরিত। পরিবারতন্ত্রের এক বিরল উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পাবনা শিল্পকলা একাডেমিকে।
পাবনা জেলা আওয়ামীলীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য আব্দুল মতীন খানের মেয়ে হওয়ায় বিগত সরকারের আমলে তার দাম্ভিকতার কাছে অসহায় ছিলো পাবনার প্রশাসন। সরকারি কর্মকর্তাদের তিনি প্রভাব দেখাতেন তার পিতার নাম ভাঙিয়ে। তিনি বলতেন রাস্ট্রপতির খুব কাছের লোক তার বাবা। কথার অবাধ্য হলে সেই কর্মকর্তাকে ভয়ভীতি দেখাতেন রাষ্ট্রপতির নাম ভাঙ্গিয়ে।
গতবছর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে শহীদ বুদ্ধিজীবী ডাঃ ফজলে রাব্বি স্মৃতি পরিষদ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক মন্ত্রনালয়ের অনুদানের আবেদন ফর্ম স্বাক্ষর করাতে গেলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিদা আক্তার বলেন, এই ফাইল তিনি স্বাক্ষর করতে পারবেন না। কারন হিসেবে তিনি জানান,জেলা কালচারাল অফিসার তাকে বলেছেন, তিনি যেন কালচারাল অফিসারকে না জানিয়ে সাংস্কৃতিক মন্ত্রানালয়ের অনুদানের কোন ফাইলে স্বাক্ষর না করেন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে ফাইলটি স্বাক্ষর করার জন্য পুনরায় অনুরোধ জানানো হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবারো বলেন, জেলা কালচারাল অফিসার নিষেধ করেছেন তাই ফাইলটি তার পক্ষে স্বাক্ষর করা সম্ভব নয়। পরের দিন বিষয়টি জেলা প্রশাসক বিশ্বাস রাসেলকে জানানো হলে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ফোন দিয়ে ফাইলটি কেন স্বাক্ষর করা হয়নি তার কারন জানতে চান। উত্তরে নির্বাহী কর্মকর্তা জেলা প্রশাসকে জানান, কালচারাল অফিসারের নিষেধ ছিলো বলে ফাইলটি স্বাক্ষর করিনি। জেলা প্রশাসক তাকে বলেন, কালচারাল অফিসারের কথাই কি শেষ কথা, আপনার যাচাই-বাছাই এর প্রয়োজন নেই। তখন নির্বাহী কর্মকর্তা জেলা প্রশাসকের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে ফিরিয়ে দেয়া সেই ফাইলে স্বাক্ষর করেন।
কালচারাল অফিসার মারুফা মঞ্জুরীর স্বজনপ্রীতির কারনে পাবনার সাংস্কৃতিক অঙ্গন বিভক্তির চরম পর্যায়ে পৌঁচেছে। কারণ হিসেবে জানা যায়, কালচারাল অফিসারের মনোনীত ও পছন্দের কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠন ছাড়া শিল্পকলা একাডেমির কোন অনুষ্ঠানে কাউকে পারফর্ম করার সুযোগ দেয়া হয় না। এবিষয়ে জেলা প্রশাসককে বারবার জানিয়েও কোন লাভ হয়নি। কারণ তার বাবা তখন জেলা প্রশাসকের ডান-বামে সবসময় অবস্থান করতেন এবং শিল্পকলার বিষয়গুলো ম্যানেজ করতেন।
পাবনা শিল্পকলা একাডেমির অলিখিত মালিক হয়ে গিয়েছিলেন তার বাবা। গত ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আবারও পুরনো অবস্থানে ফেরার পায়তারা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান ৫আগস্ট পূর্ববর্তী ভুক্তভোগী সাংস্কৃতিক সংগঠন গুলোর কর্মীরা।
তারা আরও জানান, বিগত কয়েক বছরে পাবনা শিল্পকলা একাডেমির আয়োজিত অনুষ্ঠানে কালচারাল অফিসারের বাবা,চাচা, খালা দিয়ে বিচারকের দায়িত্ব পালন করানো হয়েছে । বিচারে স্বজনপ্রীতি করে প্রকৃত প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারীদের বাদ দিয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে পছন্দসই শিক্ষার্থীদের বিজয়ী করা হয়েছে বলে অনেক অভিভাবকের অভিযোগ রয়েছে।
কালচারাল অফিসার মারুফা মন্জুরি খান এর বাবার রবীন্দ্র সম্মিলন পরিষদ ও মানবাধিকার নাট্য পরিষদ নামে দুইটি সংগঠন রয়েছে। যে সংগঠন দুটির উল্লেখযোগ্য কোন অবদান নেই এমনকি জাতীয় অনুষ্ঠান গুলোও ঠিকমত পালন করে না, কিন্তু কালচারাল অফিসারের বাবার সংগঠন হওয়ায় ঐ দুটি সংগঠনকেই শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া দুটি সংগঠনকেই সকল অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়।অথচ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক উৎসব করে এমন সংগঠনগুলোকে শিল্পকলা একাডেমির কোন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়না। একাডেমি পুরস্কারের জন্য তাদের বিবেচনা করা হয়নি। এখানেই শেষ নয় শিল্পীদের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কারেও রয়েছে চরম পক্ষপাতিত্ব। অফিসের কাজেও অনিয়ম দৃশ্যমান। যেমন শিল্পকলার বিধি মোতাবেক সরকারি চাকরি করা কেউ শিল্পকলা একাডেমিতে চাকরি করতে পারে না। কিন্তু পাবনা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে মুনতাকিম মোঃ ইব্রাহীম তন্ময় উচ্চাঙ্গ নৃত্য প্রশিক্ষক হিসাবে এবং সঞ্জিব কুমার দাশ তবলা প্রশিক্ষক হিসাবে কর্মরত রয়েছেন। এই দুইজনই সরকারি চাকরি করেন।
এছাড়া পাবনা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার মারুফা মঞ্জুরী সৌমি নিজের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার অপপ্রয়াসে শিল্পকলা একাডেমির সদস্য হওয়ার আবেদন ফর্ম জমা নিয়েও রহসজনক কারনে কাউকে সদস্যপদ দিচ্ছেন না। এই কালচারাল অফিসারকে বারবার বলার পরও এবিষয়ে তিনি কর্ণপাত করেন না। যার কারণে জেলা শিল্পকলা একাডেমি দীর্ঘ ৬বছর অবৈধ কমিটি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।
২০১৮ সালের ১৮জুলাই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সেগুনবাগিচা রমনা ঢাকা থেকে, বাশি/প্রশা:/জেশিএ/সাঃ/গ-৪২/৮৮/৯৭(১-৫) স্মারকে পাবনা জেলা শিল্পকলা একাডেমির এডহক কমিটি অনুমোদন দেয়া হয়। পাবনা জেলা প্রশাসক অফিসের ২৩-০৫-১৮ তারিখের জেশিএ/পাবনা/কমিটি/২০১৫/৩২৪ স্মারক পত্রে জানা যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী স্বাক্ষরিত এক পত্রের মাধ্যমে পাবনা জেলা প্রশাসককে সভাপতি, কালচারাল অফিসার মারুফা মঞ্জুরী সৌমি সদস্য সচিব এবং রবিউল ইসলাম রবি,আবুল কাশেম ও আশরাফ আলীকে সদস্য করে পাবনা জেলা শিল্পকলা একাডেমির জন্য ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি এডহক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। ঐ পত্রে উল্লেখ করা হয় এই এডহক কমিটি আগামী ৯০ দিন অর্থ্যাৎ ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসের ১৮ তারিখের মধ্যে জেলা শিল্পকলা একাডেমির গঠনতন্ত্র মোতাবেক কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচন সম্পাদন করে অনুমোদনের জন্য বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি অধিদপ্তরে প্রেরণ করতে হবে। কিন্তু ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসেও পাবনা শিল্পকলা একাডেমির কার্যনিবাহী কমিটির নির্বাচন সম্পাদন করা হয়নি। ছয় বছরের অধিক কাল ধরে পাবনা শিল্পকলা একাডেমি চলছে এডহক কমিটি দ্বারা।
এমতাবস্থায় ৪ ডিসেম্বর ২০২৪ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক.সৈয়দ জামিল আহমেদ স্বাক্ষরিত স্মারক নম্বর ৪৩.২০.০০০০.০১২.১৯.০০৩.২১.২৯৯(ক) অফিস আদেশ পত্রে পাবনা জেলা কালচারাল অফিসার মারুফা মন্জুরি খানকে নাটোর জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে বদলি করা হয়েছে।
এ খবরে পাবনার সাংস্কৃতিক অঙ্গন খুশির বন্যায় ভাসছে। পাবনার সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রত্যাশা খুব দ্রুততম সময়ে মারুফা মন্জুরী খানকে পাবনা থেকে সরিয়ে দিয়ে পাবনা শিল্পকলা একাডেমিতে পদায়ন করা কালচারাল অফিসার এম আরিফুজ্জামানকে যোগদান করানো হোক। এব্যাপারে তারা পাবনা শিল্পকলা একাডেমির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মফিজুল ইসলামের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
কালচারাল অফিসার মারুফা মন্জুরী খানকে পাবনা থেকে বদলী করায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক.সৈয়দ জামিল আহমেদ এর প্রতি কৃতজ্ঞগতা প্রকাশ করেছেন একুশে বইমেলা উদযাপন পরিষদের সভাপতি কমরেড জাকির হোসেন, লালন স্মৃতি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ রেজাউল করিম মনি,সূচিত্রা সেন চলচ্চিত্র সংসদ এর সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম সিরাজ,পাবনা থিয়েটার ৭৭’র সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম, উত্তরণ পাবনার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আলমগীর কবীর হৃদয়,উচ্চারণ আবৃত্তি অনুশীলন কেন্দ্র’র সভাপতি কবি ও আবৃত্তি প্রশিক্ষক সৈয়দা জহুরা ইরা, তানপুরা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সভাপতি, তারুণ্যের অগ্রযাত্রা ফাউন্ডেশন'র প্রতিষ্ঠাতা সাংবাদিক জুবায়ের খান প্রিন্স, ঝংকার শিল্পী গোষ্ঠী, শহীদ বুদ্ধিজীবী ডাঃ ফজলে রাব্বি স্মৃতি পরিষদ, পথ সাহিত্য সংসদের সভাপতি সহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।