
কিছু মৃত্যু ব্যক্তিগত। কিছু মৃত্যু সংবাদপত্রের পাতায় কয়েক কলামের একটি খবর মাত্র। কিন্তু কিছু প্রয়াণ একটি গোটা প্রজন্মকে নাড়িয়ে দেয়, তাদের শৈশবের দরজায় কড়া নেড়ে বলে, "তোমাদের সেই সোনালি দিনগুলোর এক কারিগর আজ অনন্তের পথে যাত্রা করেছেন।"
রকিব হাসানের চলে যাওয়াটা আমাদের জন্য দ্বিতীয় সেই অনুভূতি। তিনি শুধু একজন লেখক ছিলেন না, ছিলেন আমাদের কৈশোরের সেই জাদুকর, যিনি কলমের কালিতে ডুবিয়ে আমাদের জন্য এক বিস্ময়কর জগৎ তৈরি করেছিলেন। যে জগতে ছিল না কোনো সীমাবদ্ধতা, ছিল কেবল রহস্য, রোমাঞ্চ আর অদম্য সাহস।এ যেন স্মৃতির লাইব্রেরি থেকে সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে রঙিন বইটি চিরতরে হারিয়ে ফেলার মতো এক গভীর শূন্যতা।
আমাদের শৈশবটা ঠিক কোথায় বাঁধা পড়ে আছে, কেউ যদি প্রশ্ন করে? উত্তরটা খুব সোজা। রকি বিচের উত্তাল ঢেউয়ের গর্জনে, পুরোনো লোহালক্কড়ের জঞ্জালের ভেতর দিয়ে ‘সবুজ পথ দুই’-এর গোপন ফটকে, আর তিনটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন (???) আঁকা একটি ভিজিটিং কার্ডের রহস্যে। রকিব হাসান নামের সেই শব্দের জাদুকর আমাদের হাত ধরে ভূগোল বইয়ের পাতা থেকে বের করে এনেছিলেন। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন, নিজের ঘরটা বসার ঘর আর পাশেরটা শোবার ঘর নয়; একটা হলো হেডকোয়ার্টার, অন্যটা গবেষণাগার! তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, বন্ধু মানে শুধু খেলার সাথী নয়; একজন ‘দলনেতা’, একজন ‘জ্ঞানী’ আর একজন ‘পেশিশক্তি’।
কিশোর পাশা, রবিন মিলফোর্ড আর মুসা আমান—ওরা তো কেবল কাগজের চরিত্র ছিল না। ওরা ছিল আমাদের অলীক সহচর, আমাদের চেয়ে একটু বড়, একটু বেশি সাহসী আর বুদ্ধিমান অগ্রজ। গ্রীষ্মের দুপুরে যখন বাইরের পৃথিবীটা খাঁ খাঁ করত, কিংবা বর্ষার ঝমঝম শব্দে যখন চারপাশটা ধূসর হয়ে যেত, তখন রকিব হাসানের একটি বই আমাদের জন্য হয়ে উঠত ক্যালিফোর্নিয়ার সোনালি রোদের টিকেট। আমরা বই পড়তাম না, আমরা যেন কিশোরের চোখে রহস্যের জট ছাড়াতাম, রবিনের সাথে লাইব্রেরির ধুলোমাখা বইয়ে মুখ গুঁজে তথ্য খুঁজতাম, আর মুসার মতো করে বিপদের মুখেও বলে উঠতাম, "খাইছে আমারে!"
মনে পড়ে, নতুন বইয়ের গন্ধমাখা মলাট উল্টে প্রথম পাতায় চোখ রাখতেই আমরা হারিয়ে যেতাম ক্যালিফোর্নিয়ার রকি বিচে। নিজেদের অজান্তেই আমরা হয়ে উঠতাম সেই গোয়েন্দা দলের চতুর্থ সদস্য। কিশোরের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, রবিনের জ্ঞানের ভান্ডার আর মুসার অসীম শক্তির সঙ্গে আমাদের মিশে যেত অদম্য কৌতূহল। যখন জিনা আর ববের সঙ্গে কিশোর পাশার দল কোনো রহস্যের জট খুলতে ব্যস্ত, তখন আমরাও যেন সেই পুরোনো স্ক্র্যাপইয়ার্ডের হেডকোয়ার্টারে বসে তাদের সঙ্গে মাথা ঘামাতাম। প্রতিটি পাতা ওল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতরটা ধুকপুক করত—এরপর কী হবে?
তিনি আমাদের মননে যে কী আশ্চর্য এক পরিবর্তন এনে দিয়েছিলেন, তা হয়তো আমরা তখন বুঝিনি। তিনি আমাদের মগজে যুক্তির বীজ আর হৃদয়ে সাহসের চারা পুঁতে দিয়েছিলেন। যেকোনো ঘটনাকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিলেন, কৌতুহলী হতে শিখিয়েছিলেন, আর শিখিয়েছিলেন বন্ধুত্বের জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকারের মহত্ত্ব। তাঁর লেখাগুলো ছিল আমাদের মননের বাতিঘর, যা আমাদের দেখিয়েছিল—পৃথিবীটা কত বড়, কত রহস্যে ভরা আর মানুষের মন তার চেয়েও কত বেশি জটিল।
আজ যখন শুনি তিনি নেই, তখন মনে হয়, কে যেন আমাদের প্রত্যেকের শৈশবের অ্যালবাম থেকে কয়েকটি পাতা ছিঁড়ে নিয়ে গেছে। যে পাতাগুলোতে লেগে ছিল নতুন বইয়ের গন্ধ, লুকিয়ে পড়ার উত্তেজনা আর রহস্য সমাধানের পর তৃপ্তির নিঃশ্বাস। পত্রপত্রিকার কয়েক কলামের সাদামাটা সংবাদ তাঁর বিশালত্বকে ধারণ করতে অক্ষম। কারণ রকিব হাসান কোনো খবর নন, তিনি আমাদের অনুভূতি। তিনি আমাদের সেই প্রথম রোমাঞ্চ, যার রেশ আজও কাটেনি।
তাঁর মৃত্যু সংবাদটি যেন ‘তিন গোয়েন্দা’ সিরিজের শেষ কেস, যার কোনো সমাধান নেই। যার শেষে লেখা—"আবার দেখা হবে," কিন্তু আমরা জানি, সেই দেখা আর হবে না। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু আমাদের জন্য রেখে গেছেন এক অক্ষয় জগৎ। যত দিন পৃথিবীতে একটি শিশু বইয়ের পাতায় অ্যাডভেঞ্চার খুঁজবে, যত দিন বন্ধুত্ব আর সাহসের গল্প মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে, তত দিন কিশোর, রবিন আর মুসার স্রষ্টা আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।
মহান আল্লাহ আপনাকে তাঁর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দিন। বিদায়, আমাদের শৈশবের জাদুকর। আপনার জ্বালানো অনুসন্ধানের সবুজ বাতিটা আমাদের হৃদয়ে জ্বলবে, আজীবন।

মোঃ সিরাজুল ইসলাম
চিকিৎসক ও লেখক