
মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) এর উপস্থাপনকৃত ৩৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ দেখিয়েছিল পাবনার অনন্য সমাজ কল্যাণ সংস্থার সাবেক চেয়ারম্যান বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন পাবনা জেলা শাখার আহ্বায়ক আ.লীগ নেতা মাহফুজ আলী কাদেরীর বিরুদ্ধে।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মাহফুজ আলী কাদেরীর বিরুদ্ধে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) কয়েক বছর ধরেই অনন্য’র অর্থ আত্নসাতের বেশ কিছু অভিযোগ উত্থাপন করে যাচ্ছে। তাদের একটি চিঠিতে ৩৭টিরও বেশি অভিযোগ মাহফুজ আলী কাদেরীকে নিয়ে করা হয়েছে। সেখানে তিনি অনন্যর দায়িত্ব থাকাকালীন সময় থেকেই অনন্যর টাকা আত্নসাৎ, ব্যাংক থেকে এফডিআর নগদায়ন করা, স্টাফদের নামে বেতনের টাকা তোলা, প্রতিষ্ঠানের গাড়ী নিজে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা, প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজের ঘর ভাড়া দিয়ে প্রচুর টাকা তুলে নেওয়াসহ এমন বিভিন্ন অনিয়মের কথা উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সাবেক এই শীর্ষ চেয়্যারমান এখন নতুন করে অনন্য নিয়ে আগাচ্ছে, তিনি থেমে নেই। অনন্য থেকে নতুন করে নতুন কৌশলে আবারো তিনি টাকা আত্মসাতের বিভিন্ন উপায় বের করছেন বলে অনন্যর কর্মকতা কর্মচারীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এমন অভিযোগ করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিজেকে সেভ করতে সুকৌশলে ২০১৫ সালে মাহফুজ আলী কাদেরী নির্বাহী পরিচালকের পদ ছেড়ে চেয়ায়ম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং নির্বাহী পরিচালক করা হয় লিয়াকত আলী নামের একজনকে। প্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়ম, দূর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে বিশৃংখল পরিস্থিতিতে লিয়াকত আলীকে অব্যহতি দিয়ে অনন্যর নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন বরনা খাতুন। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর নানা ঝুঁকি ও নিজের বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতা দিয়ে হযবরল পরিস্থিতি কাটিয়ে তুলতে সক্ষম হন।
চলতি বছরেই সাবেক ওই নির্বাহী পরিচালকের নানা অনিয়ম, দূর্নীতি ও অর্থ আত্মসাৎ অভিযোগগুলো চলমান থাকা অবস্থাতেই নতুন করে ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়েছেন মাহফুজ আলী কাদেরী।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠান অনন্য সমাজ কল্যাণ সংস্থা ৮ হাজার সদস্যকে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়ে ফেরত পায়নি। এ কারণে এসব গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এসব গ্রাহকের কোনো অস্তিত্ব নেই। বেনামে নেওয়া ঋণের এই ১৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি সাবেক চেয়ারম্যান আ.লীগ নেতা মাহফুজ আলী কাদেরীর বিরুদ্ধে। তিনি ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের নামে ধার দেখিয়ে আরও ৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলেও অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া নিজের নামে, সাবেক স্ত্রীর নামে এবং কর্মীদের নামে অগ্রিম টাকা তোলাসহ সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানের ৩৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন মাহফুজ আলী কাদেরী।
ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে থাকা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) তদন্তে এই অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটির পাবনার প্রধান কার্যালয়সহ ৯টি কার্যালয় পরিদর্শন করে মাহফুজ আলী কাদেরীর অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পায় এমআরএর প্রতিনিধিদল।
তবে এরপরও মাহফুজ আলী কাদেরীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি অনন্য সমাজ কল্যাণ সংস্থা। এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। জানা যায়, গভর্নিং বড়ির সকল সদস্য মাহফুজ আলী কাদেরীর আত্নীয়স্বজন এবং সবাই তার অনুগত বলেই তিনি সুকৌশলে নিজেকে বাঁচাতে পারছেন।
মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি সুত্র গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, অনন্য সমাজ কল্যাণ সংস্থার বিভিন্ন কার্যালয়ে পরিদর্শনের সময় নথিপত্র পর্যালোচনা করে অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সেই অনুযায়ী প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
এমআরএর তদন্তে উঠে এসেছে, অনন্য সমাজকল্যাণ সংস্থার সাবেক চেয়ারম্যান আ.লীগ নেতা মাহফুজ আলী কাদেরী প্রতিষ্ঠানের এফডিআর করা প্রায় ৮ কোটি টাকা তুললেও প্রতিষ্ঠানে জমা দেননি। নিজের নামে, সাবেক স্ত্রীর নামে এবং কর্মীদের নামে প্রায় ৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ৩০টির বেশি অনিয়ম, দুর্নীতির তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি গাড়ি মাহফুজ আলী কাদেরী নিজে ব্যবহার করতেন। কর্মকর্তারা এমআরএর প্রতিনিধিদের জানিয়েছিলেন, চাকরি রক্ষার্থে এ ধরনের কাজে তারা রাজি হয়েছিলেন। তবে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধের অনুরোধ জানিয়েছিলেন তারা।
সে সময়ে সাবেক চেয়ারম্যান মাহফুজ আলী কাদেরী বলেন, ২০১৫ সালের পর তিনি আর এই প্রতিষ্ঠানের কোনো দায়িত্বে নেই। এমআরএ পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দিয়েছে। আর অনন্যর কোন বিষয়ে তিনি জানেন না এমনকি কোন সিদ্ধান্তে তিনি নেই।
সূত্র বলছে, অনন্য সমাজকল্যাণ সংস্থা গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে পাবনা অঞ্চলে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অন্যান্য ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের মতোই তারা ঋণ দিয়ে থাকেন।
জানা যায়, অনন্য সমাজ কল্যাণ সংস্থার সাবেক চেয়ারম্যান আ.লীগ নেতা মাহফুজ আলী কাদেরী নিজের অনিয়ম থেকে মুক্ত রাখতে নিজের সকল পদপদবী থেকে সড়িয়ে নেপথ্যে কলকাঠি নাড়াচাড়া করতেন। ছায়া হিসেবে লিয়াকত আলী নামে একজনকে নির্বাহী পরিচালক নিয়োগ করে নানা অনিময়ে তাকেও বিতাড়িত করেন। এমনই ভাবে কয়েকটা নির্বাহী পরিচালক নিয়োগ দিয়ে সবশেষে নিয়োগ বরনা খাতুনকে।
মাইক্রোকেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরআই) এর তদন্ত রিপোর্ট বলছে অনন্য সমাজ কল্যাণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন সম্পূর্ণ অবৈধ। তার নিয়োগ বাতিল করেছে এমআরআই।