শুক্রবার (১৪ জুন) বিকেলে পাবনার শহরতলীর হাজিরহাটে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, হাটে গবাদিপশুতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ী ও খামারিরা শত শত ট্রাক, মিনিট্রাক, নসিমনসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে হাজার হাজার গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও গাড়ল নিয়ে এসেছেন। হাটে জায়গা না হওয়ায় রাস্তার উভয় পাশে প্রায় এক কিলোমিটার জায়গাজুড়ে পশুরহাট বসেছে। আবার অনেককেই পশু ফেরত নিয়ে যেতে দেখা গেছে।
মালিগাছা টেবুনিয়া ভর ভাঙ্গাবাড়িয়া থেকে আসছেন ফরিদ আহমেদ। তিনি বলেন, ৪ টি ফিজিয়ান জাতের বড় গরু হাটে নিয়ে আসছি। হাটে গরুর অনেক আমদানি হয়েছে। কিন্তু কেনাবেচা তেমন হচ্ছে না। দেশী ও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি। দাম মুটামুটি ভালোই।
পাবনা সদরের দুবলিয়ার দাসপাড়া থেকে আসছে সিহাব মল্লিক। তিনি বলেন, ২ টি গরু নিয়ে আসছি ৮/৯ মন ওজনের গরু নিয়ে আসছি। দাম বলে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এ গরুর দাম না হলেও ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা হবে। এতো কম দামে গরু বিক্রি করলে লোকসান গুনতে হবে। গো-খাদ্যের যে পরিমাণ দাম বেড়েছে সে অনুযায়ী দাম পাচ্ছি না। এক বস্তা গমের ভূষির দাম ছিল ১ হাজার টাকা করে। বর্তমানে ২ হাজার ২০০ টাকা করে কিনতে হচ্ছে।
জালালপুরের রবিউল ইসলাম বলেন, সকালে ৬ টি ছোট ও মাঝারি গরু নিয়ে হাজিরহাটে আসছি। সব কয়টিই বিক্রি হয় গেছে। বড় গরুর চাহিদা খুবই কম। বড় গরুর অনেক দাম কম। আর ছোট গরুর দাম বেশি। সব মিলিয়ে দাম স্বাভাবিক রয়েছে।
আটঘরিয়ার পাটেশ্বরের জিয়াউর বলেন, ৫ টি গরু নিয়ে খুব সকালে হাটে আসছি। সারাদিনে মাত্র একটা বিক্রি করা গেছে। খুব লোকসানে আছি। এমন বাজার থাকলে বাড়ি-ঘর ছাড়তে হবে। পথে বসতে হবে। ভূষির দোকানে ১ লাখ টাকা বাকি আছে। গরু বেচাকেনা না হলে জমি বিক্রি করে দোকান বাকি পরিশোধ করতে হবে।
হাটে আসা সুজানগরের খামারী আফজাল হোসেন বলেন, তার খামারের সবচেয়ে বড় ষাঁড় গরুটির দাম হাঁকিয়েছিলেন ৬ লাখ টাকা। হাটে নিয়ে আসলে কোন ক্রেতা নেই। স্থানীয় কিছু ক্রেতা ও ব্যাপারী দাম বলছে ৩ লাখ টাকা। গরু আজকেও বিক্রি করতে পারলাম না। আগামীকাল ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করতেছি।
আজিজুল হাকিম নামের একজন কৃষক বলেন, তিনটি গরু হাটে তুলেছিলাম। প্রতিটির দাম চেয়েছিলাম পৌনে চার লাখ টাকা। অথচ ব্যাপারীরা গড়ে প্রতিটি গরুর দাম বলেছে দুই লাখ ৭০ হাজার টাকা। উপযুক্ত মূল্য না পেয়ে গরু তিনটি ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
পাবনার আতাইকুলা থেকে আসছেন রোকন আলী। তিনি বলেন, কৃষকের বাড়ি থেকে এ বছর ১০০ টির মত গরু কিনেছি। কিছু গরু ঢাকার হাটে পাঠিয়েছি। আবার কিছু গরু পাবনার বিভিন্ন হাটে বিক্রি করতেছি। বাড়ির পর থেকে বেশি দাম দিয়ে কিনে নিয়ে আসছি। হাটে সে অনুযায়ী দাম নেই বললেই চলে। এখন আমাদের এগুলো করে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে তাই করি তাছাড়া আহামরি এতো ওতো লাভ নেই।
পাবনা শহরের শালগাড়িয়া মহল্লার মো. আসাব উদ্দিন বলেন, মাঝারি আকারের একটি গুরু ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা দিয়ে কিনলাম। মাংশের জন্য কিনি নাই। আল্লাহর খুশিই প্রথম কথা। আমাদের কাছে বাজারে গরুর দাম বেশিই বলে মনে হচ্ছে।
পাবনার দোগাছি ইউনিয়নের চর আশুতোশপুরের ছোট খামারী, জহিরুল বাবু বলেন, ১০ টির মত মাঝারি গরু নিয়ে হাটে আসছিলাম। ৭ টি গরু বিক্রি করেছি। আর কয়েকটি আছে রাতের মধ্যে হয়ত বিক্রি হয়ে যাবে। একেবারে বেশিও যাচ্ছে না আবার কমও যাচ্ছে না। দাম মোটামুটি স্বাভাবিক রয়েছে। এক রকম দাম পেলে গরুকে খাওয়ানোর খরচ উঠবে তবে লাভ হবে না। আমরা খামারে যে শ্রম দিয়েছি এটার দামও উঠবে না।
হাজিরহাটের ইজারাদার ও হাট কমিটির সভাপতি রুহুল আমিন বিশ্বাস রানা বলেন, হাটে গরুর ব্যাপক আমদানি হয়েছে। কিন্তু বেচাকেনা তুলনামূলকভাবে একটু কম। তবে আগামীকাল থেকে বিক্রি বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন। তিনি আরও বলেন, হাটে ব্যাপক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রত্যেকটি মোড়ে মোড়ে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে।
পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা গৌরাংগ কুমার তালুকদার জানান, চাহিদার তুলনায় জেলায় এবার দ্বিগুণ কোরবানি পশু প্রস্তুত রয়েছে। অতিরিক্ত পশুগুলো দিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চাহিদাও কিছুটা মেটানো সম্ভব হবে। পশুপালনে ব্যয় ও দামের ব্যাপারে তিনি বলেন, শুরু থেকেই এবার গোখাদ্যের দাম কিছুটা বেশি। এর ফলে পশু পালনে খামারিদের ব্যয়ও বেড়েছে। সেদিক থেকে ন্যায্যমূল্য না পেলে তারা লোকসানে পড়বেন।
তিনি আরো জানান, জেলায় এবার কোরবানির গবাদিপশুর সংখ্যা ৬ লাখ ৩৪ হাজার ৪১৪টি। এর মধ্যে গরুর সংখ্যা ১ লাখ ৯৩ হাজার ১০০টি। এছাড়া ছাগল ৩ লাখ ৬৬ হাজার ২০০, মহিষ ৮ হাজার ৩৪ ও ভেড়া ৬৬ হাজার ৯১৬টি। জেলায় এবার কোরবানিতে চাহিদা রয়েছে ৩ লাখ ১২ হাজার ৮২৬টি। উদ্বৃত্ত রয়েছে ৩ লাখেরও বেশি গবাদিপশু।
পাবনার পুলিশ সুপার আকবর আলী মুনসী বলেন, ‘কোরবানির পশুর হাটে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য জেলা পুলিশ প্রতিটি হাটে পুলিশ মোতায়েন করেছে। নিয়মনীতি মেনে হাট পরিচালনা করতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতিটি হাটে নজরদারী রয়েছে।’ হাটে জাল টাকা শনাক্তের জন্য টিম রাখা হয়েছে।
পাবনার জেলা প্রশাসক( ডিসি) মুহা. আসাদুজ্জামান বলেন, পাবনাবাসীর কোরবানির ঈদ নির্বিঘ্নে করার জন্য নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। জাল নোট চিহ্নিত করতে মেশিন স্থাপন, হাট এবং মহাসড়কে পুলিশ টহল বাড়ানো, হাটে অতিরিক্ত হাসিল না নেয়াসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।