
২১ জুলাই, ২০২৫, উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলের এক কর্মময় দুপুর। ক্লাসরুমের জানালা দিয়ে পড়ন্ত রোদ এসে পড়েছে শিশুদের উচ্ছ্বল মুখে। হাসি, গল্প, পড়ার মিষ্টি শব্দে ভরপুর ছিল স্কুল। কিন্তু হঠাৎই ভয়াবহ এক শব্দ, বিস্ফোরণ,আতঙ্ক! বিদ্যুতের স্পার্ক, তীব্র গন্ধ, তারপরই দ্রুত ছড়িয়ে পড়া অগ্নিশিখা। আর সেই আগুনের লেলিহান জিহ্বার মাঝে, এক অসামান্য নারীর অবিনাশী প্রতিকৃতি জন্ম নিলো – মাহরিন চৌধুরী।
মাহরিন নামের আরবি অর্থ হলো জীবন্ত বা যার দীর্ঘ জীবনের কামনা করা হয়। নামটাই যেন জীবনের প্রতি কর্তব্য পালনের স্বমহিমায় ভাস্বর। বলা হয়, কিছু মানুষ জন্ম নেন শুধুই মানবতার দায় মেটানোর জন্য। মাহরিন ম্যাডাম ছিলেন তাদেরই প্রতীক। তিনি কেবল একজন শিক্ষিকা ছিলেন না, ছিলেন মাতৃস্নেহের জ্যোতির্ময় আধার। তার ক্লাসরুম ছিল স্নেহের আশ্রয়, যেখানে পড়ার চাপ নয়, বরং বেড়ে ওঠার আনন্দ, নিরাপত্তা আর বিশ্বাসের বীজ বপন করা হতো। তিনি জানতেন, শিক্ষকতার অর্থ শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়া নয়, প্রাণের মায়া দেওয়া, সুরক্ষার বর্ম দেওয়া।
সেই ভয়াল দিনে, যখন ধোঁয়া আর আগুন গ্রাস করতে শুরু করেছিল স্কুলের করিডোর, যখন আতঙ্কে কেঁপে উঠেছিল ছোট্ট প্রাণগুলো, মাহরিন ম্যাডাম নিজের সত্তাকে সম্পূর্ণভাবে ভুলে গেলেন। তার সামনে শুধুই তার সন্তানতুল্য ছাত্রছাত্রীদের ভীত চোখ। নিজের সুরক্ষা, নিজের জীবন – সবকিছুই তার কাছে গৌণ হয়ে গেল। “বাচ্চাদের বাঁচাও!” – এই একমাত্র অমোঘ আদেশ আর দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দানবীয় আগুনের মাঝে। একটি, দুটি, তিনটি… বিশটি বা সম্ভবত আরও অনেক ক্ষুদে প্রাণকে ঠেলে দিয়েছিলেন নিরাপদ বাইরের দিকে। তার হাত ছিল নির্ভরতার স্পর্শ, তার কণ্ঠ ছিল সাহসের বজ্রনির্ঘোষ। সে মুহূর্তে তিনি ছিলেন অসংখ্য বাচ্চার কাছে এক দৃঢ় চেতা মা, এক অতুলনীয় মানবতার মূর্ত প্রতীক।কিন্তু তিনি জানতেই পারেননি মানবতার এই মহান দায় মেটানোর মূল্য ছিল নিজের তাঁর অমূল্য প্রাণ। তিনি হয়তো শেষ শিশুটিকেও বের করে দিতে গিয়েছিলেন, হয়তো নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন কেউ যেন ভেতরে না থাকে। কিন্তু নিষ্ঠুর নিয়তি তাকে পিছনে ফেলে দিল। আগুনের গ্রাসে হারিয়ে গেলেন তিনি। তার দেহাংশ হয়তো ছাইয়ে ছাইয়ে মিশে গেছে, কিন্তু তার আত্মত্যাগের দীপ্ত শিখা ভস্মীভূত ছাইয়ে আরো প্রবল্ভাবে প্রজ্বলিত হয়েছে যা কখনো নিভবে না।
মাইলস্টোন দুর্ঘটনা বা ট্রাজেডি যেটাই বলি সেটা আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরাজয়, আমাদের অবকাঠামোগত চরম ব্যর্থতা। কখনো কি ভেবে দেখেছি, এসব মর্মান্তিক দুর্ঘটনার নিয়ন্ত্রক কারা? ভবন নির্মাণের নীতিমালা, নিরাপত্তা পরিদর্শন, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার যথাযথতা, জরুরি প্রোটোকল – এসবের দায় কেন শুধু একজন শিক্ষিকাকেই নিতে হবে? তারা কি আদৌ সেই ক্ষমতা বা সম্পদের অধিকারী ছিলেন, যার অভাবে এই বিপর্যয় ঘটল? তাদের ‘মানবতার দায়’ পালনের পথে কে কে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল? কে কে দায় এড়িয়ে গেছে?মাইলস্টোনের ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে যাওয়া সত্য হলো – এখানে দায় অনেক গভীরে, অনেক ঊর্ধ্বে। এখানে দায় সেই ব্যবস্থার, যে ব্যবস্থা লাভের অংকে মানুষের নিরাপত্তাকে তুচ্ছ করে। দায় সেই দায়িত্বজ্ঞানহীনতার, যে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা নজরদারির অভাবে বেড়ে ওঠে। দায় আমাদের সবার, যারা নিরাপত্তাকে ‘অবশ্যপালনীয়’ না ভেবে ‘ঐচ্ছিক’ বলে মনে করি। এই দায়ভার শুধুমাত্র মাহরিন ম্যাডামদের কাঁধে চাপানো এক চরম নিষ্ঠুরতা, এক সুবিধাবাদী দায়মুক্তির চেষ্টা মাত্র।
মাইলস্টোন স্কুল ট্রাজেডি আমাদের হৃদয়ে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। এ শুধু একটি ভবন পুড়ে যাওয়ার ঘটনা নয়, এ আমাদের সমাজের নিরাপত্তা, দায়িত্ববোধ ও মূল্যবোধের উপর এক কঠিন প্রশ্নচিহ্ন। কিন্তু এই শোকের অন্ধকারেও মাহরিন ম্যাডামের ত্যাগ জ্বলজ্বল করে উঠেছে এক অনির্বাণ দীপশিখার মতো। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, স্বার্থের এই যুগেও নিঃস্বার্থ প্রেম, কর্তব্যনিষ্ঠা আর মানবতার মাহাত্ম্য ম্লান হয়নি। তিনি দেখিয়ে গেছেন, একজন শিক্ষিকার দায়িত্ব শুধু ক্লাসে সীমাবদ্ধ নয়, তা প্রাণ দিতেও প্রস্তুত থাকার।মাহরিন ম্যাডামরা – সমাজের সেই নির্মাতা, যারা অজানাকে জানার পথ দেখান, অন্ধকারে আলোর মশাল জ্বালান। তাদের হাতেই গড়ে ওঠে দেশের ভবিষ্যৎ। ক্লাসরুম তাদের উপাসনালয়, খাতা-কলম তাদের উপাসনার উপকরণ, আর প্রতিটি শিশু তাদের কাছে একেকটি অমূল্য প্রার্থনা। তারা রক্ত-মাংসের শরীরে ধারণ করেন এক অসাধারণ আত্মত্যাগের চেতনা। ভোরের শিশির ভেজা পথ মাড়িয়ে স্কুলে আসা, রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করা, শুধুই তো একটি বিশ্বাসে – ভবিষ্যত প্রজন্মকে আলোকিত করার মহান দায়িত্ব। এটাই তো তাদের ‘মানবতার দায়’।
মাইলস্টোনের ছাইয়ের স্তূপ থেকে যে একটিই জিনিস অক্ষয় হয়ে উঠেছে, তা হল মাহরিন ম্যাডামের অনন্ত অমরত্ব। তার আত্মাহুতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়: সত্যিকারের শিক্ষকতা শুধু পাঠদান নয়, জীবন দানও বটে। তিনি চিরকাল জ্বলবেন আমাদের বিবেকের মিনারে, মানবতার সেই অগ্নিপরীক্ষায় যিনি উত্তীর্ণ হয়েছেন সোনার অক্ষরে, রক্ত দিয়ে। তার স্মৃতি হোক আমাদের পথের আলো, তার ত্যাগ হোক সমাজের নিরাপত্তা ও মানবিক মূল্যবোধকে আরও সুদৃঢ় করার অঙ্গীকার। শান্তিতে ঘুমাও, মাহরিন ম্যাডাম, তোমার অমূল্য আত্মদান বৃথা যাবে না।
মাইলস্টোনের করুণ ইতিহাস শুধু শোকের নয়, জাগরণেরও হোক। শুধু অভিযোগের নয়, দায়িত্ববোধেরও হোক।মাহরিন ম্যাডামদের জন্ম যদি সত্যিই মানবতার দায় মেটানোর জন্য হয়, তবে তাদের প্রতি আমাদেরও দায় আছে। তাদের সুরক্ষা দেওয়ার দায়। তাদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার দায়। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়। তাদের ‘মানবতার দায়’ পালনের পথকে সুগম করে দেওয়ার দায়। আসুন, মাহরিন ম্যাডামদের মতো হাজার হাজার শিক্ষকদের প্রতি এই অমানবিক দৃষ্টিভঙ্গির অবসান ঘটাই। তাদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে নিরাপদ ভবিষ্যতের ভিত্তি। তাদের প্রতি সম্মান ও সহযোগিতাই হোক মাইলস্টোন ট্রাজেডির প্রকৃত শিক্ষা। কারণ, যারা মানবতার দায় মেটাতে জন্মেছেন, তাদের পতনে পতিত হয় গোটা মানবতা। তাদের রক্ষা করাই তো আমাদের ‘মানবতার দায়’।

ডাঃ মোঃ সিরাজুল ইসলাম
লেখক, শিক্ষক ও চিকিৎসক
পাবনা মেডিকেল কলেজ